ডায়াবেটিস হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায়? ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত
আপনি কি জানতে চান আপনি ডায়াবেটিস দ্বারা আক্রান্ত নাকি? বর্তমানে বাংলাদেশে ডায়াবেটিস একটি খুবই সাধারণ রোগ। মানুষ এখন ঘরে ঘরে ডায়াবেটিস দ্বারা আক্রান্ত। ডায়াবেটিস হলে আপনার শরীর কিছু লক্ষণ প্রকাশ করবে। দেখে নিন সেই লক্ষণ গুলো আপনার মধ্যে রয়েছে নাকি।
আজকের এই পোস্টে বিস্তারিত জানবো ডায়াবেটিস হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায় সেই সম্পর্কে । সাথে ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত এবং খালি পেটে ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত? ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানতে সম্পূর্ণ পোস্টটি দেখে নিন।
ভূমিকা
ডায়াবেটিস এমন একটি রোগের নাম যেখানে শরীর রক্তের শর্করা কিংবা গ্লুকোজ সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এই পর্যায়কে বলা হয় ডায়াবেটিস। আমাদের শরীরে ইনসুলিন নামের এক হরমোন গ্লুকোজ কে কোষে পৌঁছে শক্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।
কিন্তু যখন ইনসুলিন কম তৈরি হয় বা ঠিকভাবে কাজ করতে না পারে তখন রক্তে হঠাৎ চিনির পরিমাণ বেড়ে যায় এতে ধীরে ধীরে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। অনেকেই প্রথম দিকে বুঝতে পারেন না তাদের ডায়াবেটিস হয়েছে নাকি। তাই এই লক্ষণ গুলো দেখে নিন। এই লক্ষণগুলো যদি আপনার জানা থাকে তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার ডায়াবেটিস হয়েছে নাকি।
ডায়াবেটিস হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায়
ডায়াবেটিস হলে শরীরে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করবে না এতে গ্লুকোজ জমে যাবে আর কোষগুলো শক্তি পেতে ব্যর্থ হবে। যার ফলে ডায়াবেটিসের কিছু প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিবে। ডায়াবেটিস হলে প্রথমে আপনার শরীরের কিছু লক্ষণ প্রকাশ করবে।
যেমন ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া , অতিরিক্ত পানি পিপাসা লাগা, বেশি বেশি ক্ষুধা লাগা। সাথেই আরো বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দিবে । নিচে দেখে নিন ডায়াবেটিস হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায় তা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হল।
ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া
ডায়াবেটিসের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হলো বারবার প্রস্রাব হওয়া। যখন রক্তে sugar এর পরিমাণ অনেক বেড়ে যায় তখন কিডনি অতিরিক্ত গ্লুকোজ শরীর থেকে বের করার চেষ্টা করে। এর ফলে শরীর বেশি প্রস্রাব তৈরি করতে শুরু করে। ডায়াবেটিস রোগীদের ঘনঘন প্রস্রাবের সমস্যা অতি সাধারণ।
বিশেষ করে রাতে বারবার ঘুম ভেঙে প্রস্রাব করতে যাওয়া অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ warning sign হতে পারে। শরীর অতিরিক্ত glucose বের করতে গিয়ে অনেক পানি ব্যবহার করে, ফলে প্রস্রাবের পরিমাণও বেড়ে যায়। যদি আপনার ক্ষেত্রে এমন কোন লক্ষণ দেখা যায় তাহলে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে।
শরীর সবসময় ক্লান্ত মনে হবে
আপনার যদি ডায়াবেটিস হয় তাহলে শরীর অতিরিক্ত ক্লান্ত মনে হবে। কাজকামে মন বসবে না। ডায়াবেটিস রোগীরা প্রায়ই অতিরিক্ত ক্লান্তি অনুভব করেন। কারণ শরীর glucose থেকে পর্যাপ্ত শক্তি তৈরি করতে পারে না।
রক্তে sugar বেশি থাকলে শরীরের metabolic balance নষ্ট হতে পারে। ফলে মানুষ দুর্বল, অলস এবং energy less অনুভব করতে পারেন। পর্যাপ্ত ঘুমের পরও ক্লান্তি থেকে যেতে পারে। তখন শরীরে অনেক অলস ভাব চলে আসবে।
অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগা
যখন ডায়াবেটিস হবে তখন অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগতে শুরু করবে। ডায়াবেটিস হলে শরীর খাবার থেকে ঠিকভাবে শক্তি ব্যবহার করতে পারে না। রক্তে glucose থাকলেও কোষ সেই glucose সঠিকভাবে গ্রহণ করতে না পারলে শরীর শক্তির অভাব অনুভব করে।
ফলে একজন মানুষ বারবার ক্ষুধা অনুভব করতে পারেন। অনেক সময় খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার খেতে ইচ্ছা করে। এটিকে excessive hunger বা polyphagia বলা হয়। যদি আগের তুলনাই লক্ষ্য করেন এখন অতিরিক্ত ক্ষুধা লাগছে সব সময় খাবার খেতে মন চাইছে তাহলে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে।
চোখে কম দেখা
রক্তে sugar বেড়ে গেলে চোখের lens এর মধ্যে fluid balance পরিবর্তন হতে পারে। এর ফলে চোখ ঝাপসা দেখা শুরু হতে পারে। এছাড়াও দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসের সমস্যা থাকলে চোখে ছানি পড়তে পারে। ছানি বলতে একটি পাতলা পর্দা কে বোঝানো হয়।
অনেক সময় ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চোখের রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যাকে diabetic retinopathy বলা হয়। তাই চোখ ঝাপসা দেখাকে অবহেলা করা উচিত নয়। যদি চোখে হঠাৎ করে ঝাপসা দেখে শুরু করেন কিংবা চোখের ভেতরে ঘোলাটে ভাব মনে হয় তাহলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে।
ক্ষত শুকাতে দেরি হবে
ডায়াবেটিস হলে যে কোন ক্ষত শুকাতে অনেক দেরি হয়। ডায়াবেটিস হলে প্রথমে আপনি এই লক্ষণ গুলো দেখতে পারবেন। যেকোনো কাটা ছেঁড়া শুকাতে অনেক সময় লাগবে। হাত কেটে গেলে কিংবা পা কেটে গেলে সেই ক্ষত শুকাতে অনেক সময় লাগবে এমনকি সেই জায়গাতে পচন পর্যন্ত ধরতে পারে।
হাত পায়ে ঝিন ঝিন বা অবস অনুভূত হওয়া
দীর্ঘদিন থেকে ডায়াবেটিস থাকলে হাত-পায়ে ঝিনঝিন এবং অবশ অনুভূত হবে।দীর্ঘদিন রক্তে sugar বেশি থাকলে শরীরের nerves ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে হাত বা পায়ে ঝিনঝিনি, জ্বালাপোড়া বা অবশ অনুভূতি হতে পারে।।
এটিকে diabetic neuropathy বলা হয়। শুরুতে হালকা সমস্যা মনে হলেও পরে এটি গুরুতর nerve damage এ রূপ নিতে পারে। যদি সঠিক সময় ডায়াবেটিস পরীক্ষা না করে ওষুধ সেবন না করেন তাহলে ধীরে ধীরে এটি আপনার নার্ভে নষ্ট করতে শুরু করবে এবং একপর্যায়ে আপনার নার্ভ অকার্যকর হয়ে পড়বে।
নার্ভ অকার্যকর হয়ে পড়লে হাত পা নাড়াচাড়া করা অসম্ভব হয়ে যাবে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হবে যাকে আমরা প্যারালাইসিস বলি। তাই ডায়াবেটিস থাকলে অবশ্যই সঠিক সময়ে টেস্ট করিয়ে এর ঔষধ সেবন করতে হবে।
পায়ে কাটা ফোঁটা অনুভূতি
ডায়াবেটিস থাকলে আরো একটি লক্ষণ দেখতে পাবেন। সেটি হচ্ছে পায়ে কাঁটা কোটার মতো অনুভূতি হবে। প্রতিদিন রাতে পায়ের বুড়ো আঙুলে মনে হবে মাছের কাঁটা ফুটছে অথবা কেউ কাটা দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে এমন অনুভূতি হবে।
অনেক সময় এ অনুভূতিটা অনেক তীব্র হয় আবার অনেক সময় খুব হালকা অনুভুতি হয় কিন্তু যখনই আপনি লক্ষ্য করবেন প্রতিদিন রাতে পায়ে কাটা ফোটার মত অনুভূতি হচ্ছে তাহলে দ্রুত ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে।
আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে তাহলে এই লক্ষণ গুলো দেখা যাবে।
যেকোনো একটি কিংবা দুইটি লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে এবং ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। ডায়াবেটিস খুবই মারাত্মক একটি রোগ বাংলাদেশে এখন এটি অতি সাধারণ রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও এটি খুব মারাত্মক।
ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত
তোদের ডায়াবেটিস পরীক্ষা করেন তাহলে কিভাবে জানবেন যে আপনার ডায়াবেটিস হয়েছে? ডায়াবেটিসের কিছু মাত্রা রয়েছে। যেমন ডায়াবেটিসের সাধারণ মাত্রা হচ্ছে ৪ থেকে ৮ এর নিচে।খালি পেটে ডায়াবেটিস যদি ৪ থেকে ৬ এর নিচে থাকে এবং খাওয়ার পরে যদি ৮ নিচে থাকে তাহলে এটা স্বাভাবিক ধরা হয়।
মনে করুন আপনার খালি পেটে ডায়াবেটিসের মাত্রা হচ্ছে চার থেকে পাঁচের মধ্যে কিংবা ৫.৫। তাহলে আপনার স্বাভাবিক ডায়াবেটিস। আর যদি খাবার পরে ৭-৮ এর মধ্যে হয় তাহলে স্বাভাবিক।
কিন্তু যদি আপনার ডায়াবেটিসের মাত্রা ১০ এর ওপরে হয় খাবারের পরে কিংবা খাবারের আগে তাহলে এটি অবশ্যই ডায়াবেটিসের ইঙ্গিত দেয়। যদি আপনারা সুগারের মাত্রা খাওয়ার আগের ৬ এর ওপরে হয় তাহলে এটাকে বলা হয় প্রি ডায়াবেটিস।
যাদের খাবার খাওয়ার পরে ভরা পেটে ডায়াবেটিসের মাত্রা ৮ এর বেশি হয় তাকে প্রী ডায়াবেটিস বলে। আর খালি পেটে ছয় এর ওপরে হলে তাকে প্রী ডায়াবেটিস বলে। যদি ডায়াবেটিস এর মাত্রা দশের ওপরে হয় অর্থাৎ 11 হয় তাহলে এটি ডায়াবেটিস মাত্রায় চলে আসে।
ডায়াবেটিস এর সর্বোচ্চ মাত্রা কত
অনেকেই জানতে চান ডায়াবেটিসের সর্বোচ্চ মাত্রা কত?? ডায়াবেটিসের সর্বোচ্চ মাত্রা হচ্ছে ৩০। এই অবস্থায় রোগে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। যদি ডায়াবেটিস হওয়ার পরেও নিয়মিত ডায়াবেটিসের ঔষধ সেবন না করা হয় তাহলে খুব বেশি ডায়াবেটিস হতে পারে যেমন ডায়াবেটিস ৩০ এর মধ্যে থাকতে পারে।
এই পর্যায়ে রোগে অচেতন হয়ে পড়বে রোগে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে এবং রোগীর তীব্র ডিহাইড্রেশন দেখা দিবে। তাই এই অবস্থায় অবশ্যই দ্রুত ওষুধ সেবন করতে হবে এবং ডায়াবেটিস কমিয়ে ফেলতে হবে ডায়াবেটিস সব সময় কন্ট্রোলে রাখতে হবে।
অতিরিক্ত ডায়াবেটিস স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হতে পারে। ডায়াবেটিসের ফলে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমনকি নার্ভ ফেটে যেতে পারে। ডায়াবেটিস সম্পর্কে জানতে HbAIc টেস্ট করতে হবে। এটি তিন মাসের গড় ডায়বেটিসের মাত্রা প্রকাশ করে।
ডায়াবেটিস না থাকলে নরমাল মাত্রা ৫.৭% । প্রী ডায়াবেটি ৫.৭%-৬.৪% এর মধ্যে। আর ডায়াবেটিস হলে ৬.৫% এর বেশি হবে। HbAIc টেস্টে যদি ৭% আসে তাহলে এটি অতিরিক্ত ডায়াবেটিস নির্দেশ দেয়।
আশা করি সকলে বুঝতে পেরেছেন ডায়াবেটিস এর সর্বোচ্চ মাত্রা কত এবং ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত। ডায়াবেটিসের স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ৪-৮ এর মধ্যে। আর যদি ডায়াবেটিসের মাত্রা ১০-১১ হয় তাহলে তাকে বলা হবে পূর্ণ ডায়াবেটিস।
খালি পেটে ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা হচ্ছে ৪-৬ এর মধ্যে। যদি ৬ এর বেশি হয় তাহলে প্রী ডায়াবেটিস । আশা করি সকলে ডায়বেটিসের মাত্রা সম্পর্কে ক্লিয়ার বুঝতে পেরেছেন।
আমাদের শেষ কথা
আজকের এই পোস্টে আলোচনা করলাম ডায়াবেটিস এর সর্বোচ্চ মাত্রা কত, খালি পেটে ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত, ডায়াবেটিস হলে কি কি লক্ষণ দেখা যায় এবং ডায়াবেটিস এর স্বাভাবিক মাত্রা কত। যারা ডায়াবেটিস রোগী রয়েছেন তাদের জন্য এ পোস্টটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এই পোস্টে ডায়াবেটিসের লক্ষণ গুলো শেয়ার করা হলো। ওপরের এ কোন লক্ষণ আপনার মধ্যে দেখা দিলে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে। আজকের এই পোস্টটি ভালো লেগে থাকলে কমেন্ট করে অবশ্যই জানাবেন।। আর এমন আরো নতুন নতুন পোস্ট পেতে এই ওয়েবসাইটি নিয়মিত ভিজিট করুন।

Dr-Yasin.com ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url